সিরাজগঞ্জে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ, প্রতিদিন ভাঙছে ১৩-১৫টি সংসার

নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:২৪ এএম

সংগৃহীত

সিরাজগঞ্জে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। প্রতিদিন গড়ে ১৩ থেকে ১৫টি সংসার ভাঙার ঘটনায় জেলার সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবক, সমাজবিজ্ঞানী এবং সচেতন নাগরিকরা। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছর ধরে জেলায় তালাকের হার আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সিরাজগঞ্জে মোট ১৪ হাজার ১৯৭টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়। একই সময়ে তালাকের ঘটনা ঘটে ৫ হাজার ৩৩৩টি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩৯টি বিয়ের বিপরীতে প্রায় ১৫টি বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে।

২০২৫ সালে বিয়ের সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৩১৭টিতে। ওই বছর নিবন্ধিত তালাকের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮০৩টি। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৩৬টি বিয়ের বিপরীতে ১৩টি বিচ্ছেদ হয়েছে। মোট বিয়ের প্রায় ৩৬ শতাংশই শেষ হয়েছে বিচ্ছেদে।

উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রায়গঞ্জ উপজেলায় বিবাহবিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে সেখানে ৮৪৯টি বিয়ের বিপরীতে ৫৬১টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি বিয়ের বিপরীতে প্রায় ৬৬টি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো আসক্তি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস—এসব কারণই বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) মো. শরিফ বলেন, “গত কয়েক বছরে তালাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী বেকার হয়ে পড়ছেন বা অনলাইন জুয়ার মতো ক্ষতিকর আসক্তিতে জড়িয়ে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করছেন। অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক কলহের কারণে অনেক নারী বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আগে পারিবারিক বিরোধ মুরব্বি ও স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করা যেত। এখন আপস-মীমাংসার প্রবণতা কমে যাওয়ায় ছোটখাটো বিরোধও বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াচ্ছে।”

সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির মনে করেন, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বর্তমানে দাম্পত্য কলহের অন্যতম কারণ। তার ভাষায়, “আদালতে আসা অনেক পারিবারিক মামলায় দেখা যায়, পারস্পরিক অবিশ্বাস, গোপন সম্পর্ক কিংবা অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগকে কেন্দ্র করেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হচ্ছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী, যিনি সম্প্রতি বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বলেন, “আমি সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্বামী নিয়মিত অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সংসারের খরচ দেওয়া বন্ধ করে দেন। অনেক চেষ্টা করেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের পথ বেছে নিতে হয়েছে।”

একইভাবে দুই বছর আগে বিচ্ছেদের মুখোমুখি হওয়া একজন পুরুষ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝি ও অবিশ্বাস বাড়তে বাড়তে সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে আলাদা হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তবে এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে তাদের সন্তান।

তবে এই চিত্রের বিপরীতে সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোতে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা গেছে। জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১৩৩টি এবং ২০২৫ সালে ১৪৯টি হিন্দু বিয়ে নিবন্ধিত হলেও এই দুই বছরে কোনো তালাকের ঘটনা রেকর্ড হয়নি।

সিরাজগঞ্জ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক কানিজ ফাতেমা বলেন, পারিবারিক সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত উঠান বৈঠক, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পারিবারিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহনশীলতা বৃদ্ধি করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছেদ প্রতিরোধ সম্ভব।

সচেতন মহলের মতে, ক্রমবর্ধমান বিবাহবিচ্ছেদ শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংকট নয়; এটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন ও অবক্ষয়েরও ইঙ্গিত বহন করে। তাই পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং যোগাযোগের সংস্কৃতি জোরদার না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

 

এনএফ৭১/ওতু



বিষয়:



Top