কৃষি দপ্তরের চোখে খুলনার জলাবদ্ধতার ১৫ কারণ, বছরে ১০০ কোটি টাকার ফসলহানি

এস কে বাপ্পি | প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২৬, ০১:৫৪ এএম

ছবি: সংগৃহীত

সিডর, আইলা ও আম্ফানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি খুলনায় এখন বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে জলাবদ্ধতা। বছরের প্রায় ১২ মাসই জলাবদ্ধতার কারণে বোরো, আমন ও শাক-সবজির ক্ষতি হচ্ছে। এর সঙ্গে দাবদাহ ও শৈত্যপ্রবাহে দেখা দিচ্ছে সেচ সংকট। কৃষি বিভাগের জরিপে জেলার ৮ উপজেলায় জলাবদ্ধতার পেছনে ১৫টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বছরে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পরিচালিত জরিপে নগরীর লবণচরাসহ রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া, ফুলতলা, ডুমুরিয়া, তেরখাদা, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায় ১ হাজার ১৭৮ হেক্টর জমিতে স্থায়ী এবং অতিবৃষ্টিতে আরও ৮ হাজার ৫৮৬ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা যায়।

জলাবদ্ধতার ১৫ কারণ

কৃষি বিভাগের জরিপে জলাবদ্ধতার জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • লবণচরার দীঘিরপাড় থেকে গল্লামারী ব্লক পর্যন্ত বিশ্বরোডে পানি নিষ্কাশনে বাধা
  • রূপসায় আঠারোবাকী নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া
  • নরনিয়া বিলের গভীরতা কমে যাওয়া
  • অপরিকল্পিত চিংড়ির ঘের
  • খালগুলোর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া
  • দিঘলিয়ায় অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানি
  • বটিয়াঘাটায় স্লুইসগেট দিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশন না হওয়া
  • ফুলতলার দক্ষিণাঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকা
  • ডুমুরিয়ায় অতিবৃষ্টি ও নিচু জমিতে পানি জমে থাকা
  • তেরখাদার ভুতিয়ার বিলে দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়া
  • পাইকগাছায় খাল ভরাট
  • স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা
  • সরকারি খাস খাল উন্মুক্ত না থাকা
  • আগের তুলনায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি
  • কয়রার ছোট চাঁদখালী খাল ভরাট ও অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন না হওয়া

বোরো ও তরমুজ চাষে বড় ক্ষতি

চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতেই শৈত্যপ্রবাহে ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও তেরখাদার বীজতলা শুকিয়ে যায়। আবার এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুতে হঠাৎ বৃষ্টিতে বোরো ধান ও দাকোপের তরমুজ ক্ষেতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। মাঝারি বৃষ্টিতেও অনেক এলাকায় বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

অস্তিত্ব সংকটে ১২ নদী

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় ১২টি নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। প্রায় ৩৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব নদীর মধ্যে রয়েছে শোলমারী, হামকুড়া, হরি, ভদ্রা, আপার সালতা, চিত্রা, শিবসার একাংশ, আঠারোবাকী, কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া, কয়রা ও ময়ূর নদী। নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্ষাকালে আশপাশের এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না।

এছাড়া বটিয়াঘাটা ব্রিজ নির্মাণের ফলে কাজিবাছা নদীর প্রবাহ কমে গিয়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে জলাবদ্ধতা আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

যা বলছে কৃষি বিভাগ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সুবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, অপরিকল্পিত ঘরবাড়ি, চিংড়ির ঘের, খাল ভরাট ও নিচু জমির কারণেই জলাবদ্ধতা বাড়ছে। তিনি জানান, ডুমুরিয়া-ফুলতলার অভিশাপ হিসেবে পরিচিত বিল ডাকাতিয়ায় খাল খনন কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে ডুমুরিয়া ও ফুলতলার নিচু জমিতে শাক-সবজির আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। আগাম বৃষ্টিতে দক্ষিণ ডুমুরিয়ার সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় দাকোপের কৃষকরা তরমুজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

তেরখাদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিউলী মজুমদার বলেন, সাচিয়াদাহ, ছাগলাদাহ ও তেরখাদা ইউনিয়নের নিচু জমিতে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয় না। ভুতিয়ার বিলে প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। খাল পুনঃখনন ও স্লুইসগেট সচল করা গেলে জলাবদ্ধতা কমবে এবং আবাদি জমির পরিমাণও বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।



বিষয়:



Top