মোদির নীতি নিয়ে আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
মোদির ‘আইসোলেশন পলিসি’ কেন সফল হলো না?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ১ জুন ২০২৬, ০৯:৫০ এএম
পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে ভারত। তবে সেই কৌশল প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। তাদের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে গৃহীত ‘ডিপ্লোম্যাটিক আইসোলেশন’ নীতি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে একঘরে করার পরিবর্তে নতুন কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এবং বিশেষ করে ২০১৬ সালের উরি হামলার পর ভারত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। জাতিসংঘ, সার্ক ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় দিল্লি।
ভারতের এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমানো, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সমর্থন সীমিত করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব আরও শক্তিশালী করা। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের কারণে সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি বলে মনে করছে আল-জাজিরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে চীনের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের মাধ্যমে বেইজিং ইসলামাবাদে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিয়েছে।
এছাড়া আফগানিস্তান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের মতো বিষয়গুলোতে পাকিস্তানের ভূমিকাকে উপেক্ষা করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রও। ফলে ওয়াশিংটন একদিকে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করলেও অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের গভীর অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্কও দেশটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকতে সহায়তা করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
আল-জাজিরার মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই বহুমাত্রিক বা মাল্টিপোলার হয়ে উঠছে। ফলে কোনো একটি দেশের পক্ষে অন্য একটি রাষ্ট্রকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। দেশগুলো এখন নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে একঘরে করার চেষ্টায় ভারত দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোকেও দুর্বল করেছে। বিশেষ করে সার্কের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলা এবং বালাকোট অভিযানের মতো ঘটনাগুলোর পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরাসরি কোনো পক্ষ নেয়নি। বরং অধিকাংশ দেশ সংযম ও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান এখনও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা সংকটে থাকলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আফগানিস্তান প্রশ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে তার কৌশলগত গুরুত্ব পুরোপুরি হারায়নি।
সব মিলিয়ে আল-জাজিরার মূল্যায়ন হলো, পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ভারতের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেনি। বরং পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় ইসলামাবাদ নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এনএফ৭১/ওতু
বিষয়:
