আরেকটি মসজিদকে মন্দির ঘোষণা, ভারতে কি এখন হিন্দু শাসন চলছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ২২ মে ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ধার শহরের ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদ, যা ভোজশালা চত্বর নামেও পরিচিত, সেটিকে ঘিরে নতুন করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন, মধ্যযুগীয় এই স্থাপনাটি মূলত হিন্দু দেবী বাগদেবীর উদ্দেশ্যে নির্মিত একটি মন্দির ছিল। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর মুসলিমদের ওই স্থানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

রায়ের পর রোববার মসজিদ চত্বরে গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা। সেখানে ধর্মীয় সংগীত, নাচ এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে দেখা যায়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই চত্বরে একটি অস্থায়ী দেবীমূর্তিও স্থাপন করা হয়। এ ঘটনায় ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটির মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৭৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিক বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত এটি মুসলিমদের মসজিদ ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে গেছে।

ভারতে ঐতিহাসিক মসজিদকে মন্দির দাবি করার ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন মসজিদকে কেন্দ্র করে একই ধরনের দাবি বাড়তে থাকে। এমনকি তাজমহলের নিচেও মন্দিরের অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

কামাল মাওলা মসজিদ নিয়ে কয়েক দশক ধরেই বিরোধ চলছে। ২০০৩ সালের এক সমঝোতা অনুযায়ী হিন্দুরা প্রতি মঙ্গলবার এবং মুসলিমরা প্রতি শুক্রবার সেখানে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেতেন। তবে নতুন রায়ের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে।

আদালতের রায়ে মসজিদটিকে বাগদেবীর মন্দির ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুসলিমদের আবেদন খারিজ করা হলেও অন্যত্র মসজিদ নির্মাণের জন্য বিকল্প জমি চাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ দুই বছর আগে ওই স্থানে একটি জরিপ পরিচালনা করে। সেই জরিপের ভিত্তিতেই আদালত এ রায় দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

মুসলিমপক্ষের আইনজীবীরা রায়কে ত্রুটিপূর্ণ বলে দাবি করেছেন। তাদের মতে, এটি ভারতের উপাসনালয় আইন ১৯৯১-এর পরিপন্থী। ওই আইনে স্বাধীনতার সময় যেকোনো উপাসনালয়ের ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, এই রায় অযৌক্তিক এবং এটি মুসলিম উপাসনালয়গুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় তৈরি করছে। তার মতে, বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত রায়ের ধারাবাহিকতায় নতুন করে আরও মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে বলেন, ভারতে বর্তমানে যেভাবে মসজিদগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা হিন্দু জাতীয়তাবাদের গভীরে থাকা ইসলামবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।

১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতা বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পর ভারতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। পরে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১৯ সালে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বিতর্কিত জমি রামমন্দির নির্মাণের জন্য হিন্দুদের হাতে তুলে দেন।

বর্তমানে কাশীর জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং মথুরার শাহি ঈদগাহ মসজিদ নিয়েও একই ধরনের দাবি উঠেছে। সমালোচকদের মতে, ধর্মীয় স্থাপনাকে কেন্দ্র করে এই রাজনীতি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলছে। সূত্র: আল-জাজিরা

এনএফ৭১/একে



বিষয়:



Top