সংসদ ভবন থেকে উধাও ১৩৪৩ কপার বার, মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২৬, ১১:৪২ পিএম
রাষ্ট্রের অন্যতম সুরক্ষিত স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবনের স্টোররুম থেকেই উধাও হয়ে গেছে ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বাসবার। সরকারি হিসাবে যার মূল্য প্রায় ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা। এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ ভারী ধাতব সরঞ্জাম সংসদ ভবনের মতো কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা থেকে গায়েব হলো, তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’-এর আওতায় প্রায় ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে সংসদ ভবনের নবম তলায় এবিসিডি সাব-স্টেশনে ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল কাজ সম্পন্ন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডেক্স করপোরেশন লিমিটেড। প্রকল্পের আওতায় নতুন সরঞ্জাম ব্যবহারের কথা থাকলেও পরে দেখা যায়, পুরোনো কিছু কপার বার পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছে। কাজ শেষে অবশিষ্ট মালপত্র স্টোরে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে মিলছে না সেই কপার বাসবারগুলোর অস্তিত্ব।
সংসদ ভবন সূত্রে জানা যায়, চারটি সাব-স্টেশনের মধ্যে ডি স্টেশনের কাজ শেষে ৩৪২টি কপার বাসবার স্টোরে জমা দেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী। পরবর্তীতে দায়িত্বে আসেন মো. আনোয়ার হোসেন। তার দায়িত্বকালেই বাকি কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হলেও পুরোনো কপার বারগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এ ঘটনায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্রেও মিলেছে নানা অসংগতি। একই কাজের জন্য দুই দফায় সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করা হলেও দুই প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে রয়েছে গরমিল। কোথাও স্বাক্ষর নেই, কোথাও তারিখ অনুপস্থিত, আবার কোথাও সরঞ্জামের পরিমাণ ও মূল্য পরিবর্তন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে এবং অনিয়ম আড়াল করতেই পুরোনো মালপত্র গায়েবের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এদিকে তদন্ত শুরুর আগেই দায় চাপানো হয়েছে উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনের ওপর। তবে তিনি দাবি করেছেন, মাত্র পাঁচ মাস দায়িত্বে ছিলেন এবং কখনোই তাকে স্টোর বা প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
প্রকৌশলীদের তথ্যমতে, এডেক্স করপোরেশনের কাজ শেষে প্রথম সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করা হয় প্রায় দুই বছর পর। পরবর্তীতে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি দ্বিতীয়বার সার্ভে রিপোর্ট করা হয়। কিন্তু দুটি রিপোর্টের মধ্যে সরঞ্জামের পরিমাণ ও মূল্য নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দায় এড়াতেই পরবর্তীতে নতুন করে নথিপত্র তৈরি করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২১ জানুয়ারি স্টোররুম পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বারের মধ্যে অল্প কিছু বার ছাড়া বাকি সব উধাও। অথচ কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে, এসব মালপত্র এমএমপি স্টোরে সংরক্ষিত রয়েছে।
এ ঘটনায় চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডেক্স করপোরেশন লিমিটেডের সিইও প্রকৌশলী নুরুন নবী সুজন দাবি করেছেন, তাদের প্রায় সব কাজ শেষ হলেও এখনো কিছু বিল বকেয়া রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাহী প্রকৌশলী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কম বিল দিয়েছেন। এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে কপার বার চুরি বা গায়েব হওয়ার বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালিকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা ভালো বলতে পারবেন। তদন্ত প্রতিবেদনে কী এসেছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জাতীয় সংসদ ভবনের মতো স্পর্শকাতর ও নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা থেকে এত বিপুল পরিমাণ কপার বাসবার কীভাবে উধাও হলো? এটি কি শুধুই চুরি, নাকি এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের দুর্নীতির জাল—সেই উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়:
