যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন জ্বালানি সমঝোতা, কেন বাড়ছে আলোচনা?

নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২৬, ০৩:৩৯ এএম

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জ্বালানি খাতে নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েক মাস আগেই দুই দেশের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিতে আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল বাংলাদেশ। এর মধ্যেই নতুন সমঝোতা হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কেন আবার আলাদা জ্বালানি সহযোগিতা চুক্তি?

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, নতুন এই সমঝোতার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা এবং দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর জ্বালানি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সমঝোতা করা হয়েছে। বিশেষ করে এলএনজি ও এলপিজির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বড় একটি বিকল্প উৎস হতে পারে বলে জানান তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এ সমঝোতার ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ জ্বালানির জন্য ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে তেল ও এলএনজি আমদানি করা হয়। তবে ইরান যুদ্ধের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চল থেকে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। কাতার চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করতে না পারায় বাংলাদেশকে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনতে হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। তবে সমঝোতার নামে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে জ্বালানি কিনতে হলে তা দেশের স্বার্থের জন্য ভালো হবে না। সমঝোতার বিস্তারিত প্রকাশের পরই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সমঝোতা স্মারকটিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট।

দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ সমঝোতার আওতায় তেল, গ্যাস, ভূতাপীয় ও জৈবশক্তি খাতে দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময়, গবেষণা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি সহজ হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, একক উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জ্বালানির বিকল্প উৎস থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিতে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কেনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া বাংলাদেশের গ্যাস খাতেও আগে থেকেই মার্কিন কোম্পানিগুলোর শক্ত অবস্থান রয়েছে।

জ্বালানি বিষয়ক সাময়িকী ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার’-এর সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি শেভরন। এছাড়া এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনা, গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলপিজি সরবরাহেও মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকার এখন বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহে গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন সমঝোতার ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের আমদানি আরও বাড়তে পারে।



বিষয়:



Top