যিলহজ্বের প্রথম দশ দিনের ফজীলত ও আমল

ধর্ম ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

সংগৃহীত

আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের জন্য উপহারস্বরূপ দান করেছেন ফযীলতপূর্ণ বিভিন্ন দিবস ও রজনী। যাতে এই সময়গুলোকে কাজে লাগিয়ে বান্দা ক্ষমা লাভ করতে পারে, নেক আমল সমৃদ্ধ করতে পারে এবং আল্লাহর প্রিয়জনদের কাতারে শামিল হতে পারে। তন্মধ্যে যিলহজ্বের প্রথম দশক অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব রাখে। কেননা এ দিনগুলোতেই ইসলামের অন্যতম বিধান হজ্বের মৌলিক আমল সম্পাদিত হয়। দশম যিলহজ্ব সারা বিশ্বের মুসলিমগণ কুরবানী করেন। এ দশক এতটাই ফযীলতপূর্ণ ও মহিমান্বিত যে, আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে এ দশ রাতের কসম করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَ الْفَجْرِ، وَ لَيَالٍ عَشْرٍ.

'শপথ ফযরের, শপথ দশ রজনীর।' (সূরা ফাজর, আয়াত নং ১-২) 

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও মুজাহিদ রাহ.-সহ অনেক মুফাসসির বলেন, এখানে ‘দশ রাত্রি’ দ্বারা যিলহজ্বের প্রথম দশ রাতকেই বুঝানো হয়েছে।

এ দশককে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন বলা হয়েছে। হযরত আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

أفضلُ أيامِ الدنيا أيام العشرِ يعني عشرَ ذِي الحجةِ قيلَ ولَا مِثْلُهُنّ فِي سَبِيلِ اللهِ؟ قَالَ: ولَا مِثْلُهُنّ فِي سَبِيلِ اللهِ إلّا مَنْ عَفَّرَ وجهَه في الترابِ

'দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হল, যিলহজ্বের দশ দিন। জিজ্ঞাসা করা হল, আল্লাহর রাস্তায়ও কি তার সমতুল্য নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায়ও তার সমতুল্য নেই। তবে ঐ ব্যক্তি, যে তার চেহারাকে ধূলিযুক্ত করেছে। অর্থাৎ শাহাদাত লাভ করেছে।'

( মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৪/২০)

এ দিনগুলোর নেক আমল আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয়। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

 ما من أيامٍ العمَلُ الصالحُ فيها أحَبُّ إلى اللهِ من هذه الأيامِ العَشْرِ، قالوا: ولا الجهادُ في سَبيلِ اللهِ؟ قال: ولا الجهادُ في سَبيلِ اللهِ، إلّا رجُلٌ خرَجَ بنَفْسِه ومالِه، ثم لم يَرجِعْ من ذلك بشيءٍ.

'আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও (এর চেয়ে উত্তম) নয়? তিনি বললেন, না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁ, সেই ব্যক্তির জিহাদ এর চেয়ে উত্তম, যে নিজের জান-মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হয়েছে। অতঃপর কোনো কিছু নিয়ে ঘরে ফিরে আসেনি। অর্থাৎ শহীদ হয়েগিয়েছে।' (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৬৯)

বিশেষত নবম দিন তথা আরাফা দিবসের ফজীলত বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النّارِ، مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ.

'এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আরাফার দিনের চেয়ে বেশি সংখ্যক বান্দাকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন।' (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪৮)

তাছাড়া এ দশকের যে দিনটি বিশেষ তাৎপর্য ধারণ করে তা হচ্ছে যিলহজ্বের দশম তারিখ। হাদীসের ভাষায় যাকে ‘ইয়াওমুন নাহর’ আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

إِنّ أَعْظَمَ الْأَيّامِ عِنْدَ اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النّحْرِ.

'আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার নিকট সবচেয়ে মহিমান্বিত দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমুন নাহর’ তথা কুরবানীর দিন।' (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭৬৫)

 উক্ত আয়াত ও হাদীসের আলোকে যিলহজ্বের প্রথম দশকের অনেক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। সুতরাং মুমিন বান্দাদের উচিত ইবাদাতের এই বসন্তকালকে নেক আমল দ্বারা প্রাণবন্ত করে তোলা।

করণীয় আমলসমূহ

(ক) 

তাওবা-ইস্তিগফার, যিকির-তিলাওয়াত, দোয়া-মুনাযাত, দান-সদকা প্রভৃতি নেক আমলের মাধ্যমে এ দিনগুলো জীবন্ত রাখা। বিশেষ করে হাদীসে উল্লেখিত যিকিরগুলো পাঠ করা। যেমন, হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

مَا مِنْ أَيّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ وَلَا أَحَبّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيهِنّ مِنْ هَذِهِ الْأَيّامِ الْعَشْرِ، فَأَكْثِرُوا فِيهِنّ مِنَ التّهْلِيلِ وَالتّكْبِيرِ وَالتّحْمِيدِ.

'এমন কোনো দিন নেই, যা আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের (যিলহজ্বের প্রথম দশ দিন) চেয়ে অধিক মহান এবং এসব দিনের আমলও অন্যান্য দিনের তুলনায় তাঁর কাছে অধিক প্রিয়। তাই তোমরা এ দিনগুলোতে বেশি বেশি ‘তাহলীল’ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ), ‘তাকবীর’ (اللهُ أَكْبَرُ) এবং ‘তাহমীদ’ (الْحَمْدُ لِلّٰهِ) পাঠ করো।' (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬১৫৪)

(খ) 

রোযা রাখার প্রতি বিশেষ মনোনিবেশ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্বের প্রথম নয় দিন রোযা রাখার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন। হাদীসে বর্ণিত আছে,

كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجّةِ.

'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্বের নয়টি দিবসে (সাধারণত) রোযা রাখতেন।' (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৭)

বিশেষত নবম তারিখ আরাফার দিনে রোযার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

صيامُ يومِ عرفةَ إنِّي أحتسبُ على اللَّهِ أن يُكفِّرَ السَّنةَ الَّتي قبلَهُ والَّتي بعدَهُ

'আরাফার দিনের (নয় যিলহজ্বের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি, তিনি পূর্বের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।' (ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৪১৬)

(গ) 

এছাড়া এ দশকের একটি বিশেষ আমল হল, যিলহজ্বের চাঁদ ওঠা থেকে নিয়ে কুরবানীর পশু জবাই করা পর্যন্ত নখ-চুল না কাটা, না ছাটা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ইরশাদ করেন,

 مَن رأى هلالَ ذي الحجَّةِ، وأرادَ أن يضحِّيَ، فلا يأخذنَّ مِن شَعرِهِ، ولا من أظفارِهِ

'যে ব্যক্তি যিলহজ্বের চাঁদ দেখবে এবং কুরবানী করার ইচ্ছা রাখবে, সে যেন তার চুল ( মাথার চুল, বোগলের চুল, গোঁপ, গুপ্তাঙ্গের লোম) এবং নখ (হাতের হোক বা পায়ের) না কাটে।' (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭৭) 

অতএব যিলহজ্ব আগমনের পূর্বেই নখ-চুল কেটে পরিপাটি হয়ে থাকা বাঞ্ছনীয়। এতে করে হাজী সাহেবদের সাথে এক ধরনের সাদৃশ্য তৈরি হয়, যা আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম একটি উপায়ও বটে। 

(ঘ)

যিলহজ্ব মাস হচ্ছে হজ্ব ও কুরবানী আদায়ের মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাদেরকে এ নেক আমল আদায়ের তাওফীক দিয়েছেন, তাদের কর্তব্য হলো গুরুত্ব সহকারে এই এবাদত দুটি প্রতিপালনে যত্নবান থাকা। কেননা বিশুদ্ধ পন্থায় হজ আদায়কারীর জন্য হাদীস শরীফে অনেক সুসংবাদ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 

 الحَجُّ المَبرورُ ليس له جَزاءٌ إلّا الجَنَّةَ.

'মাকবুল হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।'(বোখারী শরীফ, হাদীস নং ১৭৭৩)

অনুরুপভাবে আল্লাহর সন্তুষ্ট লাভের জন্য কুরবানী আদায়কারীদের জন্যেও রয়েছে বিভিন্ন পুরস্কার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

١- ما عمِلَ آدميٌّ من عملٍ يومَ النَّحرِ أحبَّ إلى اللَّهِ من إهراقِ الدَّمِ إنَّهُا لتأتي يومَ القيامةِ بقرونِها وأشعارِها وأظلافِها وأنَّ الدَّمَ ليقعُ منَ اللَّهِ بمكانٍ قبلَ أن يقعَ منَ الأرضِ فطيبوا بها نفسًا.

'কুরবানীর দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কুরবানী করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন কুরবানীর পশু তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত হবে। আর কুরবানীর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহ তাআলার নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানী কর।' ( তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ১৪৯৩)

(ঙ)

যিলহজ্ব মাসের নয় তারিখ ফজর থেকে নিয়ে তের যিলহজ্ব আসর পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরয নামাযের পর নারী-পুরুষ সকলের জন্য একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। তাকবীরে তাশরীক হল-

اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لَا إِلهَ إِلّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، وَلِلهِ الْحَمْدُ.

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ফজিলতপূর্ণ এই দিবসগুলোকে নেক আমল দ্বারা পরিপূর্ণ করার তাওফীক দান করুন। আমিন।

মুফতি ইউসুফ ইমদাদী

মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামী ঢাকা।

 

এনএফ৭১/ওতু



বিষয়:



Top