সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় ও ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) ধাপে ধাপে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, ই-নামজারি, অভিযোগ দাখিল এবং জমির তথ্য যাচাই এখন অনলাইনে সহজেই করা যাচ্ছে।
আগে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে ভূমি অফিসে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার যাতায়াতের প্রয়োজন পড়ত। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ই-খাজনা কার্যক্রম চালুর পর প্রতিবছর অনলাইনে কর পরিশোধকারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ নাগরিক অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও রয়েছেন, যারা বিদেশে বসেই নিজেদের জমির কর পরিশোধ করছেন।
জমি কেনাবেচার পর মালিকানা হালনাগাদ বা নামজারি ছিল সবচেয়ে জটিল প্রক্রিয়াগুলোর একটি। অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালের সহায়তা নিতেন এবং সরকারি ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতেন।
বর্তমানে অনলাইনে নামজারি আবেদন চালুর ফলে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে। আবেদনকারী নিজেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করে আবেদন করতে পারছেন এবং মোবাইল ফোনে আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। প্রতিটি ধাপে এসএমএসের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তথ্যও পাচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ১ কোটির বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান বলেন, অনলাইনে নামজারি চালুর ফলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমেছে। পাশাপাশি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মাঠ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ভূমি সংক্রান্ত প্রতারণা রোধে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকেই ভুয়া কাগজপত্রের কারণে প্রতারণার শিকার হতেন। এখন অনলাইনে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও জমির পরিমাণ সহজেই যাচাই করা যাচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের সব ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার পুরোনো রেকর্ড স্ক্যান করে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র শনাক্তকরণ, একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা প্রতিরোধ এবং আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অটোমেশনের ফলে ভূমি সেবার তথ্য ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও রাজস্ব বিভাগের তথ্য সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা গেলে জমি কেনাবেচার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকানা হালনাগাদ করা সম্ভব হবে।